বিরল পাণ্ডিত্যের অধিকারী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বিদগ্ধ অধ্যাপক আচার্য ক্ষুদিরাম দাস মহাশয়ের জীবনপঞ্জির গুরুত্বপূর্ণ অংশ

ক্ষুদিরাম দাসের জন্ম বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড়-এ ১৯১৬ সালের ৯ অক্টোবর। তিনি প্রয়াত হন নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে ২০০২ সালের ২৮-এ এপ্রিল। তাঁর পিতার নাম সতীশচন্দ্র দাস এবং মাতার নাম কামিনীবালা দেবী। তাঁর প্রথম পত্নীর নাম প্রতিভা দাস এবং দ্বিতীয়া পত্নীর নাম শোভনা দাস। তাঁর সন্তানসস্ততিরা হলেন যথাক্রমে ভারতী, বানীমঞ্জরী, প্রদীপ, অরুপ, অপূর্ব, রূপমঞ্জরী, লীলামঞ্জরী, মল্লিমঞ্জরী, শ্যামামঞ্জরী ও ইন্দুমঞ্জরী।Dadu_Portrait

শিক্ষাজীবন – তাঁর শিক্ষা শুরু হয় বাঁকুড়া জেলায়ে কেশবচন্দ্র মণ্ডলের পাঠশালায়। তারপর পড়াশোনা করেন বেলিয়াতোড় মধ্য ইংরাজি স্কুলে এবং বাঁকুড়া ওয়েজলিয়ান মিশন কলেজে (অধুনা ক্রিশ্চিয়ান কলেজ)। স্নাতকোত্তর স্তরে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ১৯৩৭ সালে সংস্কৃত অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। এর মধ্যেই সংস্কৃত আদ্য ও মধ্য পরীক্ষায় পাশ করেছিলেন। ১৯৩৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.. –তে রেকর্ড মার্কস সহ প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে সসম্মানে উত্তীর্ণ হন। বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণপদক সহ পাঁচটি স্বর্ণপদক পান এবং রেকর্ড মার্কসের জন্যে স্যার আশুতোষ রৌপ্যপদক পান। বাংলায় এম.. ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি সংস্কৃতে কাব্যতীর্থ ও বিদ্যারত্ন উপাধি অর্জন করেন। ১৯৪১ সালে সাফল্যের সঙ্গে বি.টি. পাশ করেন।

কর্মজীবন – ১৯৪২ সালে কয়েক মাসের জন্যে স্কুল ইন্সপেক্টর পদে চাকুরী দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তীকালে, ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত অধ্যাপনা করেছেন যথাক্রমে ক্যালকাটা উইমেন্স কলেজ, স্কটিশ চার্চ কলেজ, প্রেসিডেন্সি কলেজ, কোচবিহার রাজ কলেজ, সেন্ট্রাল ক্যালকাটা কলেজ (বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ), কৃষ্ণনগর কলেজ, হুগলী মহসীন কলেজ, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি রামতনু লাহিড়ী অধ্যাপক এবং বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, তৎসহ আধুনিক ভারতীয় ভাষাসমূহের বিভাগীয় প্রধান হিসাবে যোগদান করেন ১৯৭৩ সালে এবং ১৯৮১ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজ্য পুস্তক পর্ষদের প্রকল্পিত “Bengali Linguistic Dictionary for both Bengalis and Non-Bengalis” নামে বাংলাভাষা চর্চা ও প্রসারের ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ, নানা খণ্ডে প্রকাশিতব্য একটি সুবৃহৎ অভিধান প্রণয়নের কাজে নিযুক্ত হন। ১৯৯৬ সালে এই অতিবৃহৎ এবং অতন্ত্য প্রয়োজনীয় অভিধান রচনা সমাপ্ত হয়ে প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা পড়ে, যা আজও প্রকাশ পায় নি। পরবর্তীকালে তিনি তাঁর কৃষ্ণনগরের শিক্ষক সরণির বাসগৃহে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অতিবাহিত করেন।

সম্মাননা – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে প্রথম ডি।লিট।। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ‘বৈষ্ণব রসপ্রকাশ’ গ্রন্থটির জন্য ১৯৭৩ সালে প্রাণতোষ ঘটক স্মৃতি পুরস্কার। গদ্য সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮৪ সালে ‘বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কার’। ১৯৮৭ সালে হাওড়া পণ্ডিত সমাজ প্রদত্ত ‘সাহিত্য রত্ন’ উপাধি। ১৯৮৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সরোজিনী বসু স্বর্ণপদক’। ১৯৯১ সালে কলকাতা টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রদত্ত ‘রবিন্দ্রতত্ত্বচার্য’ উপাধি। ‘চোদ্দশ সাল ও চলমান রবি’ গ্রন্থটির জন্য তিনি ‘রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার’ পান ১৯৯৪ সালে। ১৯৯৫ সালে পান নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায় স্মারক পুরস্কার। ১৯৯৮ সালে পান কলকাতা সংস্কৃত কলেজ প্রদত্ত ‘রবিতীর্থংকর’ উপাধি।

নির্মোহ, প্রচারবিমুখ, দৃঢ় ও উচ্চ আদর্শের পরম বিবেকবান ও বিরল পাণ্ডিত্যের অধিকারী মানুষটি ছিলেন নিরহঙ্কার, অসামান্য ছাত্রদরদী, আর্তের সেবক, স্বচ্ছ ও পরিশুদ্ধ দৃষ্টিসম্পন্ন, মানবিকতার কর্মে ও জ্ঞানে সমুজ্জ্বল। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার তিনি ছিলেন প্রাণপুরুষ। বিশেষ উল্লেখ্য, জন্মভূমি বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড় গ্রামে যামিনী রায় কলেজটির তিনি প্রতিষ্ঠাতা। আচার্য ক্ষুদিরাম দাস ছিলেন মানবিক সরল জীবনধর্মের প্রতীক এবং জ্ঞান ও বিদ্যাশিক্ষা সাধনার ক্ষেত্রে এক মহৎ অনুপ্রেরণা।

 


 

আচার্য ক্ষুদিরাম দাস জন্মশতবর্ষ উদযাপন সমিতি, ২০১৬-২০১৭, কৃষ্ণনগর, নদীয়া-র পক্ষে ভারতী বাগচী কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত।

Advertisements